Home ইসলামিক জীবন আমরা কেন নামায পড়বো… কেনই বা ভালো কাজ করবো না?

আমরা কেন নামায পড়বো… কেনই বা ভালো কাজ করবো না?

76
0
SHARE




একটু সুন্দর মনে ভালোভাবে চিন্তা করি? আমাদের শুরুটা কোথা থেকে। নিশ্চয় বলবেন হযরত আদম (আঃ) এবং মা হাওয়া (আঃ)। এখন দেখি তাদের শেষ কোথায়, নিশ্চয় বলবেন মৃত্যু দিয়ে। শেষ যদি হয় মৃত্যু দিয়ে তবে বোঝা যাচ্ছে আমাদের শেষটাও হবে মৃত্যু দিয়ে।

এখন কাজের কথায় আসা যাক…..মৃত্যুর পরে আমাদের যে হিসাব নিকাশ হবে তাতে আমার অবস্থান কি হবে। আমি দুনিয়াতে যা করেছি তাতে নেকির পরিমান বেশি ছিল না পাপের পরিমাণ বেশি ছিল। এগুলির হিসাব নিকাশে যদি নেকির পরিমাণ বেশি হয় ইনশ্‌আল্লাহ জান্নাত আর যদি পাপের পরিমান বেশি হয় তবে হবে জাহান্নাম।

যারা নিজেদের গুনাহের জন্য তওবা করে তারা জান্নাতী : যারা প্রকৃত মু’মিন তারা ভুলক্রমে কোন খারাপ কাজ করে ফেললে তার জন্য তারা অনুতপ্ত হয়, তারা এজন্য তওবা করে। আল্লাহ্ তাদের এ অনিচ্ছাকৃত গুনাহ্ ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ্ বলেন- ‘(ভাল মানুষ হচ্ছে তারা) যারা যখন কোন অশ্লীল কাজ করে ফেলে কিংবা (এর দ্বারা) নিজেদের উপর নিজেরা জুলুম করে ফেলে (সাথে সাথেই) তারা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং গুনাহের জন্যে (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করে। কেননা আল্লাহ তা’য়ালা ছাড়া আর কে আছে যে (তাদের) গুনাহ্ মাফ করে দিতে পারে? (তদুপরি) এরা জেনে বুঝে নিজেদের গুনাহের উপর কখনো অটল হয়ে বসে থাকে না। এই (সে বৈশিষ্ট্যম-লীত) মানুষগুলো! মালিকের পক্ষ থেকে তাদের প্রতিদান হবে, আল্লাহ্্ তা’য়ালা তাদের ক্ষমা করে দেবেন। আর (তাদের) এমন এক জান্নাত (দিবেন) যার তলদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা বইতে থাকবে, সেখানে (নেককার) লোকেরা অনন্তকাল অবস্থান করবে। সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের জন্যে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) কত সুন্দর প্রতিদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত- ১৩৫-১৩৬

আল্লাহর নিয়ামতের অকৃতজ্ঞকারীরা জাহান্নামী : যারা দুনিয়ায় আল্লাহর দেয়া নিয়ামতসমূহের কথা অস্বীকার করে এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করে না তারা জাহান্নামী।
দুনিয়ার দিকে একটু চক্ষু নিক্ষেপ করলে, একটু চিন্তা-বিবেচনা করলেই বুঝা যায়, আল্লাহ্ মানুষের জন্য অসংখ্য নিয়ামত দিয়ে এই দুনিয়া ভরপুর করে রেখেছেন। মানুষের শরীরের এক একটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আল্লাহ্্র দেয়া নিয়ামত। প্রকৃতির মধ্যে সৃষ্ট যেমন- চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র এগুলো সবই মানুষের কল্যাণের জন্য সৃষ্ট নিয়ামত। প্রতিটি উদ্ভিদ ও প্রাণী মানুষের কোন না কোন কল্যাণে নিয়োজিত। ফল-ফুল, শস্য ও ফসলে ভরপুর এই সমগ্র বিশ্বের প্রতিটি জিনিস মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত। যারা এই নিয়ামতের অকৃতজ্ঞকারী তাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ বলছেন-
(হে নবী) আপনি কি তাদের অবস্থা পর্যক্ষেণ করেননি যারা আল্লাহ্ তা’য়ালার নেয়ামত অস্বীকার করার মাধ্যমে (তা) বদলে দিয়েছে, পরিণামে তারা নিজেদের জাতিকে ধ্বংসের (এক চরম) স্তরে নামিয়ে এনেছে। জাহান্নামের অতলে (সেখানে) তারা সবাই প্রবেশ করবে, কত নিকৃষ্ট সেই বাসস্থান! এরা আল্লাহ্ তা’য়ালার জন্য কিছু সমকক্ষ উদ্ভাবন করে নিয়েছে, যাতে করে তারা (সাধারণ মানুষকে) তাঁর পথ থেকে বিভ্রান্ত করতে পারে; (হে নবী! এদের) আপনি বলুন (সামান্য কিছু দিনের জন্যে) তোমরা ভোগ করে নাও, অতঃপর (অচিরেই জাহান্নামের) আগুনের দিকে তোমাদের ফিরে যেতে হবে।’ (সূরা ইব্রাহিম, আয়াত- ২৮-৩০)

যারা কুফরী করে তাদের ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম : কুফরীর পরিণাম হচ্ছে জাহান্নাম। আল্লাহ্ বলেন- ‘কাফেরদের ব্যাপারে কখনো এ কথা ভেবো না যে, তারা যমীনে (আমাকে) অক্ষম করে দিতে পারবে, তাদের ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম, (আর) কতো নিকৃষ্ট এ ঠিকানা।’ (সূরা আন্ নুর, আয়াত- ৫৭
কাফিরদের ধন-মাল ও সন্তান-সন্ততি পরকালে কোন কাজে আসবে না : দুনিয়ার কোন সম্পদই পরকালে কোন কাজে আসবে না। এ ‘সম্পদ’ ধন-সম্পত্তি হোক বা সন্তান-সন্ততি হোক। এ সম্পর্কে কুরআনে পাকে আল্লাহ্ বলেন-‘আল্লাহ্ তা’য়ালার (শাস্তি) থেকে (তাদের বাঁচানোর জন্য) সেদিন তাদের ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি কোনটিই কোন কাজে আসবে না। তারা তো দোযখেরই বাসিন্দা, সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে।’ (সূরা মুজাদালাহ্, আয়াত- ১৭)
ঈমানদার পুরুষ ও নারীদের ওপর যারা জুলুম-নিপীড়ন চালায় তাদের স্থান জাহান্নাম : যারা ঈমানদার পুরুষ ও নারীদের উপর জুুলুম-নির্যাতন করে তাদের জন্য জাহান্নাম। আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে বলেন-‘যারা মোমেন নর-নারীদের ওপর অত্যাচার করেছে, অতঃপর তারা কখনো তওবা করেনি। তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের (কঠিন) আযাব এবং তাদের জন্যে আরো রয়েছে (আগুনে) জ্বলে-পুড়ে যাওয়ার শাস্তি।’ (সূরা বুরুজ, আয়াত-১০)
যারা ঈমান আনার পর নেক আমল করে তাদের জন্য জান্নাত : যারা আল্লাহ্্র ওপর পূর্ণ ঈমান আনবে এবং সে অনুযায়ী নেক আমল করবে আল্লাহ্্ তাদেরকে জান্নাত দিবেন। আল্লাহ্ বলেন- ‘নিশ্চয়ই যারা (আল্লাহ্ তা’য়ালার ওপর) ঈমান এনেছে এবং (ঈমানের দাবী অনুযায়ী) ভালো কাজ করেছে, তাদের জন্যে রয়েছে এমন জান্নাত যার নীচ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত রয়েছে, সেটাই (সেদিনের) সবচেয়ে বড় সাফল্য।’ (সূরা বুরুজ, আয়াত- ১১)

ভাল কাজ মানুষকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যায় আর খারাপ কাজ মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায় : যারা ঈমানদার তারা সবসময় ভাল কাজ করে এবং অন্যদেরকেও ভাল কাজের দিকে ডাকে ও উৎসাহ দেয়। যারা বেঈমান তারা সবসময় খারাপ কাজে লিপ্ত থাকে এবং অন্যদেরকেও এ কাজে উৎসাহ দেয়। আল্লাহ্ বলেন- (হে মানুষ! তোমরা এ পার্থিব জীবনের ধোকায় পড়ে আছ, অথচ) আল্লাহ্ তা’য়ালা (তোমাদের চিরস্থায়ী) এক শান্তির নিবাসের দিকে ডাকছেন; তিনি যাকে ইচ্ছা করেন তাকে সহজ সরল পথে পরিচালিত করেন। যারা ভালো কাজ করেছে (যাবতীয়) কল্যাণ তো থাকবে তাদের জন্যে এবং (থাকবে তার চাইতেও) বেশী, সেদিন তাদের চেহারা কোন কালিমা ও হীনতা দ্বারা আচ্ছন্ন থাকবে না; তারাই (হবে) জান্নাতের অধিবাসী, তারা সেখানে থাকবে চিরকাল। (অপরদিকে) যারা মন্দ কাজ করেছে (তাদের) মন্দের প্রতিফল মন্দের মতোই হবে, অপমান তাদের আচ্ছন্ন করে ফেলবে; সেদিন আল্লাহর আযাব থেকে তাদের রক্ষাকারী কেউই থাকবে না, (তাদের চেহারা এমনি কালো হবে) যেন রাতের অন্ধকার ছিঁড়ে (তার) একটি টুকরো তাদের মুখের উপর ছেয়ে দেয়া হয়েছে, এরা (হচ্ছে) জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।’ (সূরা ইউনুস, আয়াত- ২৬-২৭)

জান্নাত পেতে হলে দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করতে হবে : দুনিয়াকে আল্লাহ্ তা’য়ালা অত্যন্ত সুন্দরভাবে সাজিয়েছেন। প্রতিটি বস্তুকে মানুষের জন্য আকর্ষণীয় করে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ্ মানুষের জন্য নারী জাতি, সন্তান-সন্ততি, কৃষি জমি, পার্থিব সম্পদ ইত্যাদি লোভনীয় করে সৃষ্টি করেছেন। যারা এসবের মোহ ত্যাগ করবে এবং এগুলোর ভালবাসার চেয়ে আল্লাহর ভালবাসাকে অগ্রাধিকার দিবে, তারাই জান্নাত লাভ করবে। আল্লাহ্ বলেন- ‘নারী জাতির প্রতি ভালোবাসা, সন্তান-সন্ততি, কাঁড়ি কাঁড়ি সোনা-রূপা, পছন্দসই ঘোড়া, গৃহপালিত জন্তু ও যমীনের ফসল (সব সময়ই) মানব সন্তানের জন্যে লোভনীয় করে রাখা হয়েছে (আসলে) এ সব হচ্ছে পার্থিব জীবনের কিছু ভোগের সামগ্রী মাত্র। (স্থায়ী জীবনের) উৎকৃষ্ট আশ্রয় তো একমাত্র আল্লাহ্ তা’য়ালার কাছেই রয়েছে। হে নবী! আপনি (তাদের) বলুন, আমি কি তোমদের এগুলোর চাইতে উৎকৃষ্ট কোন বস্তুর কথা বলবো ? (হ্যাঁ, সে উৎকৃষ্ট বস্তু হচ্ছে তাদের জন্যে) যারা আল্লাহকে ভয় করে, এমন সব লোকদের জন্যে তাদের মালিকের কাছে রয়েছে (মনোরম) জান্নাত, যার পাদদেশ দিয়ে প্রবাহমান থাকবে (অগণিত) ঝর্ণাধারা এবং তারা সেখানে অনাদিকাল থাকবে, আরো থাকবে (তাদের) পুত-পবিত্র সঙ্গী ও সঙ্গীনীরা। সর্বোপরি থাকবে আল্লাহ্ তা’য়ালার (অনাবিল) সন্তুষ্টি; আল্লাহ্ তা’য়ালা নিজ বান্দাদের (কার্যকলাপের) ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত- ১৪-১৫)
কুরআনের অন্যত্র আল্লাহ্ বলেন- “হে ঈমানদার ব্যক্তিরা যদি তোমাদের পিতা ও ভাইয়েরা কখনো ঈমানের ওপর কুফরীকেই বেশি ভালোবাসে, তাহলে তোমরা এমন লোকদের কখনো বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না; তোমাদের মধ্যে যারা এ (ধরনের) লোকদের (নিজেদের) বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে, তারা হচ্ছে (সুস্পষ্ট) জালেম। হে নবী ! বলুন যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের বংশ, গোত্র এবং তোমাদের ধন-সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছ এবং ব্যবসা বাণিজ্য যা তোমরা অচল হয়ে যাবে বলে তোমরা ভয় কর, তোমাদের বাড়ি-ঘরসমূহ, যা তোমরা (একান্তভাবে) কামনা কর, যদি (এগুলো) তোমরা আল্লাহ্ তা’য়ালা, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চাইতে বেশি ভালোবাস, তাহলে তোমরা আল্লাহ্ তা’য়ালার পক্ষ থেকে তাঁর (আযাবের) ঘোষণা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা কর, (জেনে রেখো) আল্লাহ্ তা’য়ালা কখনো ফাসেক সম্প্রদায়কে হেদায়েত করেন না।’ (সূরা আত্ তাওবা, আয়াত- ২৩-২৪)

পাপ হচ্ছে জাহান্নামের কামাই আর নেক আমল হচ্ছে জান্নাতের কামাই : যে সমস্ত লোক আল্লাহ্ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে থাকে, আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করে, যে কোন প্রকার পাপ করতে দ্বিধা করে না, তারা মনে করে জাহান্নামের আগুন তাদের স্পর্শ করবে না। পাপ করাই যাদের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য, তাদের স্থান হবে জাহান্নাম। আর যারা নেক আমল করবে, নেক আমল করাই যাদের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য, তারা জান্নাতী। আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে এই কথাগুলো এইভাবে বলেছেন- ‘হ্যাঁ, যে কোন ব্যক্তি পাপ কামিয়েছে এবং যাকে তার পাপ ঘিরে রেখেছে, এমন লোকেরাই হচ্ছে জাহান্নামের অধিবাসী এবং সেখানে তারা চিরদিন অবস্থান করবে। (আবার) যারাই আল্লাহ্ তা’য়ালার ওপর ঈমান আনবে এবং নেককাজ করবে, তারা বেহেশতবাসী হবে, তারা সেখানে চিরদিন থাকবে।’ (সূরা বাক্বারা, আয়াত- ৮১-৮২)

গোমরাহ্ লোকদের কিয়ামতের দিনের অবস্থা : গোমরাহ্ লোকদেরকে আল্লাহ্্ কিয়ামতের দিন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকৃত অবস্থায় উত্তোলন করবেন। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ্্ তা’য়ালা কুরআনে পাকে বলেন- ‘যাকে আল্লাহ্ তা’য়ালা হেদায়েত দান করেন সেই মূলত হেদায়েত প্রাপ্ত হয়, আর যাকে তিনি গোমরাহ্ করেন তাদের (হেদায়েত দানের) জন্যে (হে নবী) আপনি তাঁকে ছাড়া আর অন্য কাউকেই সাহায্যকারী পাবেন না; এমন সব গোমরাহ্ লোকদের আমি কিয়ামতের দিন মুখের ওপর ভর দিয়ে চলা অবস্থায় একত্রিত করবো, এরা তখন হবে অন্ধ, বোবা ও বধির; এদের সবার ঠিকানা হবে জাহান্নাম; যতবার তা স্তিমিত হয়ে আসবে ততবার আমি তাকে তাদের জন্যে (প্রজ্জ্বলিত করে) আরো বাড়িয়ে দিব।’ (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত- ৯৭)
দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্যে যারা জিহাদ ও হিজরত করে জান্নাতে তাদের জন্যে সর্বোচ্চ মর্যাদা : ঈমানের দাবীই হলো আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালানো। এ দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য যদি পরিবার পরিজন ত্যাগ করতে হয় তাও করতে হবে। প্রয়োজনে তাকে যদি স্বদেশও ত্যাগ করতে হয় তাও করতে হবে। আর এই ত্যাগী লোকদের জন্য জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা রয়েছে। আল্লাহ্ বলেন- ‘যারা (আল্লাহ্ তা’য়ালার ওপর) ঈমান এনেছে, (তাঁর সন্তুষ্টির জন্যে) হিজরত করেছে এবং আল্লাহ্ তা’য়ালার পথে তাদের জান-মাল দিয়ে জিহাদ করেছে, তাদের মর্যাদা আল্লাহ্ তা’য়ালার কাছে সবার চাইতে বড় এবং এ ধরনের লোকেরাই (পরিণামে) সফলকাম হবে। তাদের মালিক তাদের জন্যে নিজ তরফ থেকে দয়া, সন্তুষ্টি ও এমন এক (সুরম্য) জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছেন, যেখানে তাদের জন্যে চিরস্থায়ী নিয়ামতের সামগ্রীসমূহ (সাজানো) রয়েছে, সেখানে তারা হবে চিরস্থায়ী। অবশ্যই আল্লাহ্ তা’য়ালার কাছে (মোমেনদের জন্য) মহাপুরস্কার (সংরক্ষিত) রয়েছে।’ (সূরা আত্ তাওবা, আয়াত- ২০-২২)

জান্নাতুল ফিরদাউসের উত্তরাধিকারী : বেহেস্তের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম বেহেস্ত হলো জান্নাতুল ফিরদাউস। এই ফিরদাউসের উত্তরাধিকারী হতে হলে একজন মু’মিনকে কি কি গুণের অধিকারী হতে হবে তা পবিত্র কুরআনে নিম্নোক্তভাবে বর্ণিত হয়েছে-
‘নিঃসন্দেহে (সেসব) ঈমানদার মানুষেরা মুক্তি পেয়ে গেছে, যারা নিজেদের নামাজে একান্ত বিনয়াবনত হয়, যারা অর্থহীন বিষয় থেকে বিমুখ থাকে, যারা (রীতিমতো) যাকাত প্রদান করে, যারা তাদের যৌন অঙ্গসমূহের হেফাজত করে, তবে নিজেদের স্বামী-স্ত্রী কিংবা (পুরুষদের বেলায়) নিজেদের অধিকারভুক্ত (দাসী)দের ওপর (এ বিধান পযোজ্য) নয়, (এখানে হেফাজত না করার জন্যে) তারা কিছুতেই তিরস্কৃত হবে না, অতঃপর (বিধিবদ্ধ উপায়) ছাড়া যদি কেউ অন্য কোন পন্থায় যৌন কামনা চরিতার্থ করতে চায়, তাহলে তারা সীমালঙ্ঘনকারী বলে বিবেচিত হবে। যারা তাদের কাছে রক্ষিত আমানত ও অন্যদের দেয়া প্রতিশ্রুতিসমূহের হেফাযত করে, যারা নিজেদের নামাজসমূহের ব্যপারে সমধিক যতœবান হয়। এ লোকগুলোই হচ্ছে মূলতঃ জমিনে আমার যথার্থ উত্তরাধিকারী, জান্নাতুল ফিরদাউসের উত্তরাধিকারও এরা পাবে, এরা সেখানে চিরকাল থাকবে।’ (সূরা আল মু’মিনুন, আয়াত- ১-১১)
কুরআনের অন্যত্র আল্লাহ্ বলেন- ‘যারা আল্লাহ্্তা’য়ালার ওপর ঈমান এনেছে এবং সে অনুযায়ী নেক আমল করেছে, তাদের মেহমানদারীর  জন্যে জান্নাতুল ফিরদাউস সাজানো রয়েছে। সেখানে তারা চিরদিন থাকবে, সেদিন তারা সেখান থেকে অন্য কোথাও যেতে চাইবে না। (সূরা ক্বাহাফ, আয়াত- ১০৭-১০৮)

জান্নাতী লোকেরা জান্নাতে ভাই ভাই হিসেবে থাকবে : জান্নাতের মধ্যে কোন প্রকার হিংসা-বিদ্বেষ বা দলাদলি থাকবে না। জান্নাতী লোকেরা সেখানে পরস্পর ভাই ভাই হিসেবে বসবাস করবে। আল্লাহ্্ পবিত্র কুরআনে এই কথাটি এভাবে বর্ণনা করেছেন- ‘যারা আল্লাহ্্ তা’য়ালাকে ভয় করে তারা সেদিন অবশ্যই জান্নাত ও ঝর্ণাধারায় বহুমুখী নিয়ামতে অবস্থান করবে। এই বলে তাদের অভিভাদন জানানো হবে তোমরা শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে সেখানে প্রবেশ কর। তাদের অন্তরে ঈর্ষা-বিদ্বেষ যাই থাক আমি সেদিন তা দূর করে দিব, তারা একে অপরের ভাই হয়ে পরস্পরের মুখোমুখি সেখানে অবস্থান করবে। সেখানে তাদের কোন রকম অবসাদ স্পর্শ করতে পারবে না, আর তাদের সেখান থেকে কোন দিন বেরও করে দেয়া হবে না।’ (সূরা আল হিজ্র, আয়াত- ৪৫-৪৮)

জান্নাতী লোকদের মেহমানদারী : জান্নাতের মেহমানদারী কেমন হবে তা দুনিয়ার ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। সেখানে সুখের কোন সীমা-পরিসীমা থাকবে না। জান্নাতী লোকেরা যখন যা চাইবে তখন তা পাইবে, মনে যা আকাংখা করবে তাই তাদের সামনে এসে হাজির হবে। জান্নাতী লোকদের মেহমানদারীর কিছু বর্ণনা পবিত্র কুরআন শরীফে নিম্নোক্তভাবে উল্লেখ করা হয়েছে- ‘জান্নাতী লোকেরা থাকবে স্বর্ণখচিত আসনের ওপর, তার ওপর তারা একে অপরের মুখোমুখি আসনে হেলান দিয়ে বসবে। তাদের চারপাশে তাদের সেবার জন্য চির কিশোরদের একটি দল ঘুরতে থাকবে, পানপাত্র ও সুরাভর্তি পেয়ালা নিয়ে এরা প্রস্তুত থাকবে, সেই সুরা পান করার কারণে তাদের কোন শিরপীড়া হবে না, তারা কোন রকম নেশাগ্রস্তও হবে না, সেখানে আরো থাকবে তাদের নিজ নিজ পছন্দমত ফলমূল, থাকবে তাদের মনের চাহিদা মোতাবেক রকমারী পাখির গোশত; সেবার জন্যে মজুদ থাকবে সুন্দর চক্ষুধারী হুরগণ, তারা হবে সুন্দর-সুশ্রী, লুকাইয়া রাখা মুক্তার মত।
এর সব কিছুই হচ্ছে তাদের সে কাজের পুরস্কার যা তারা দুনিয়াতে করে এসেছে। সেখানে তারা কোন অর্থহীন প্রলাপ বা কথাবার্তা শুনতে পাবে না, সেখানে বরং বলা হবে শুধু শান্তি, নিরবচ্ছিন্ন শান্তি। অতঃপর আসবে ডান পার্শ্বের লোক, আর কারা এ ডান পার্শ্বের লোক, তারা অবস্থান করবে এমন এক উদ্যানে যেখানে থাকবে শুধু কাঁটাবিহীন বরই গাছ, থাকবে কাঁদি কাঁদি কলা, শান্তিদায়িনী ছায়া দূর-দূরান্ত পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে, আর থাকবে প্রবাহমান ঝর্ণাধারার পানি, পর্যাপ্ত পরিমাণ ফলমূল, এমন সব ফল যার সরবরাহ কখনো শেষ হবে না এবং যার ব্যবহার কখনো নিষিদ্ধও করা হবে না, আর থাকবে উঁচু উঁচু বিছানা; আমি তাদের সাথী হুরদের বানিয়েছি বানানোর মতো করেই, তাদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আমি তাদের চিরকুমারী করে রেখেছি, তাদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা হবে সমবয়সের প্রেম সোহাগিনী, এগুলো হচ্ছে প্রথম দলের সব ডানপার্শ্বের লোকদের জন্যে।’ (সূরা ওয়াক্বিয়াহ্, আয়াত- ১৫-৩৮)

জাহান্নামের লোকদের আতিথেয়তা ও মেহমানদারী : জান্নাতী লোকেরা বেহেস্তে পাবে অতীব আরামদায়ক ও পরম সুখের আতিথেয়তা। অপরপক্ষে জাহান্নামীরা সেখানে পাবে অতিকষ্টদায়ক ও অত্যন্ত পীড়াদায়ক আতিথেয়তা। পবিত্র কুরআনে জাহান্নামী লোকদের আতিথেয়তার কিছু নমুনা নিম্নোক্তভাবে দেওয়া হয়েছে- ‘(হে নবী!) আপনি বলুন, অবশ্যই আগের ও পরের সব লোককেই একটি নির্দিষ্ট দিনে একটা নির্দিষ্ট সময়ে জড়ো করা হবে। অতঃপর কাফেরদেরকে বলা হবে ওহে পথভ্রষ্ট ও এ দিনের আগমন মিথ্যা প্রতিপন্নকারী ব্যক্তিরা, দুনিয়ায় যা অর্জন করেছ তার বিনিময়ে আজ তোমরা ভক্ষণ করবে ঝাক্কুম নামক একটি গাছের অংশ, অতঃপর তা দিয়েই তোমরা তোমাদের পেট ভর্তি করবে, তার ওপর তোমরা পান করবে জাহান্নামের ফুটন্ত পানি, তাও আবার পান করতে থাকবে মরুভূমির তৃষ্ণার্ত উটের মতো করে, এ হবে কিয়ামতে তাদের যথার্থ মেহমানদারী।’ (সূরা আল ওয়াক্বিয়াহ্, আয়াত- ৪৯-৫৬)

কুরআনের অন্যত্র আল্লাহ্ বলেন : ‘তার একটু পেছনেই রয়েছে জাহান্নাম, (সেখানে) গলিত পুঁজ জাতীয় পানি পান করানো হবে, সে অতি কষ্টে তা গলাধঃকরণ করতে চাইবে, কিস্তু গলাধঃকরণ করা তার পক্ষে কোন মতেই সম্ভব হবে না, (উপরন্তু) চারদিক থেকেই তার মৃত্যু আসবে, কিন্তু সে কোনমতেই মরবে না, বরং তার পেছনে থাকবে (আরো) কঠোর আযাব।’ (সূরা ইব্রাহিম, আয়াত- ১৬-১৭)
কিয়ামতের সেই ভয়াবহ দিনে মানুষ পরস্পর পরস্পরকে দোষারোপ করবে; কিন্তু এ দোষারোপ কোন কাজে আসবে না। দুনিয়ার যেসব তাগুতী নেতা-নেত্রীর তারা আনুগত্য করেছিল, যাদের কারণে তারা আজ জাহান্নামে যাচ্ছে, তখন আফসোস করে বলতে থাকবে, যদি আমাদেরকে আর একবার সুযোগ দেয়া হতো তা হলে তারা এসব নেতা-নেত্রীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেখিয়ে দিত। কিন্তু তাদের সেদিনের আফসোসের আর কোন মূল্য থাকবে না। জাহান্নামের আযাব থেকে বের হওয়ার তাদের আর কোন উপায় থাকবে না। পবিত্র কুরআনে একথাগুলো নিম্নোক্তভাবে বর্ণিত হয়েছে- ‘সেদিন ভয়াবহ শান্তি দেখে হতভাগ্য লোকেরা দুনিয়ায় যাদের তারা মেনে চলতো, তাদের অনুসারীদের সম্পর্কচ্ছেদের কথা বলবে বলবে, আমরা তো এদের চিনিই না, এদের সাথে তাদের সব সম্পর্ক সেদিন ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। যারা তাদের অনুসরণ করেছে তারা সেদিন বলবে, আবার যদি একবার আমাদের জন্যে পৃথিবীতে ফিরে যাবার সুযোগ থাকতো, তাহলে আজ যেমনি করে তারা আমাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছে, আমরা সেখানে গিয়ে তাদের সাথে যাবতীয় সম্পর্কচ্ছেদ করে আসতাম, এভাবেই আল্লাহ্ তা’য়ালা তাদের কর্মকান্ডগুলো তাদের ওপর একরাশ লজ্জা ও আক্ষেপ হিসেবে দেখাবেন ; এরা কখনো সেই জাহান্নাম থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না।’ (সূরা আল বাক্বারা, আয়াত- ১৬৬-১৬৭)
কিয়ামত বা শেষ বিচারের দিন জান্নাত ও জাহান্নামের চূড়ান্ত ফয়সালা হয়ে যাবে : কিয়ামতের দিন দুনিয়ার সকল মানুষ ও জ্বিন জাতিকে একত্রিত করা হবে। তাদের সব নেক ও বদ আমলের পুংখানুপুংখ হিসাব হবে। এরপর তাদের সকলেরই জান্নাত ও জাহান্নামের চুড়ান্ত ফয়সালা হয়ে যাবে।যারা জান্নাত লাভ করবে তারা চিরকাল জান্নাতে থাকবে, আর যারা জাহান্নাম লাভ করবে তারা চিরকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা’য়ালা একথাগুলো এভাবে বর্ণনা করেছেন-‘যে দিন তোমাদের আগে পরের সব মানুষ ও জ্বিন জাতিকে একত্র করা হবে একত্র করা হবে সে মহাসমাবেশের দিনটির জন্য, যেদিন বলা হবে, হে মানুষ ও জ্বিন! আজকের দিনটিই হচ্ছে তোমাদের আসল লাভ লোকসানের দিন; লাভের দিন তার জন্য যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে, তিনি আজ তার গুণাহ্ মোচন করে দিবেন এবং তাকে তিনি এমন এক সুরম্য জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার তলদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হবে, তারা সেখানে অনন্তকাল অবস্থান করবে ; আর এটাই হচ্ছে পরম সাফল্য। এটা লোকসানের দিন তাদের জন্যে যারা আল্লাহ্ তা’য়ালাকে অস্বীকার করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এদের ব্যপারে সিদ্ধান্ত হচ্ছে, এরা সবাই জাহান্নামের অধিবাসী হবে এবং সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে ; কতো নিকৃষ্ট সেই আবাসস্থল!’ (আত্ তাগাবুন: ৯-১০)

কুরআনের অন্যত্র আল্লাহ্ বলেছেন-‘এক মহা বিপর্যয় সৃষ্টিকারী দুর্যোগ! কি সেই মহা দুর্যোগ? আপনি জানেন সেই মহা দুর্যোগটা কি? এ হচ্ছে এমন একদিন যেদিন মানুষগুলো পতঙ্গের মত (ইতস্তত) বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে, পাহাড়গুলো রং-বেরঙের ধুনা তুলার মত হবে; অতঃপর যার ওজনের পালা ভারী হবে, সে অনন্তকাল ধরে সুখের জীবন লাভ করবে; আর যার ওজনের পালা হালকা হবে হাবিয়া দোযখই হবে তার আশ্রয়দায়িনী মা, আপনি কি জানেন সেই ভয়াল আযাবের গর্তটি কি ? তা হচ্ছে প্রজ্বলিত আগুনের এক বিশাল কুন্ডলী।’ (সূরা আল ক্বারিআহ্, আয়াত- ১-১১)

এভাবে শেষ বিচারের দিন জান্নাত ও জাহান্নামের চূড়ান্ত ফয়সালা হয়ে যাবে। জান্নাতীরা চির সুখের জান্নাতে অনন্তকাল বসবাস করতে থাকবে আর জাহান্নামীরা চির অশান্তির জায়গা জাহান্নামের আযাব অনন্তকাল ধরে ভোগ করতে থাকবে। আল্লাহ্্ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে জান্নাত লাভ করার তৌফিক দান করুন এবং জাহান্নামের সেই কঠিন আযাব থেকে রক্ষা করুন। আমিন। আমিন।

LEAVE A REPLY